ম্যাক—আমেরিকান
ম্যাকের সঙ্গে আমার দেখা হয় মেক্সিকোয়—চিহুয়াহুয়া সিটিতে—নববর্ষের পূর্ব সন্ধ্যায়। সে ছিল স্বদেশের এক ঝলক বাতাস, অমার্জিত এক আমেরিকান। আমার মনে পড়ে চী-লীতে একপাত্র টম-আর-জেরির (Tom and Jerry—সুরাসারযুক্ত পানীয় বিশেষ) জন্য হোটেল থেকে আমরা যখন হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছিলাম তখন প্রাচীন ক্যাথিড্রালে মধ্যরাত্রের মাস (Mass)[১]-এর জন্য ফাটা ঘন্টাগুলো উন্মত্তের মতো বাজছিল। আমাদের মাথার ঊর্ধ্বে তপ্ত মরুভূমির তারার দল। সারা শহর জুড়ে কুয়ারটেলগুলো (Cuartels—শিবিরগুলো), যেখানে ভিলার (Villa)[২]সেনাবাহিনী সন্নিবেশিত ছিল সেখান থেকে, নিরাবরণ পাহাড়গুলোর ওপরের সুদূর ছাউনিগুলো থেকে রাস্তাগুলোর রক্ষীদের কাছ থেকে পরম উল্লসিত গুলির শব্দ আসছিল। প্রমত্ত এক অফিসার আমাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফিয়েস্তাকে (Fiesta—উৎসব) ভুল করে চিৎকার করে উঠেছিল “খ্রীষ্ট ভূমিষ্ঠ হলো!” পরের মোড়ে একদল সৈনিক, সেরাপেতে (Serepe—মেক্সিকান কম্বল, ক্লোক হিসাবে ব্যবহৃত হয়) চোখ পর্যন্ত ঢেকে সেই অন্তহীন কাব্যগীতি “ফ্রান্সসিসকো ভিলার উদ্দেশ্যে প্রভাত সঙ্গীত” গাইতে গাইতে একটা আগুনের কুণ্ডের ধারে বসেছিল। প্রতিটি গায়ককে মহান ক্যাপ্টেনের বীরত্বপূর্ণ কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে একটা করে নতুন স্তবক রচনা করতে হচ্ছিল...।
প্লাজার ছায়াচ্ছন্ন পথগুলোর মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছিল আবার রাস্তাগুলোর মুখের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল, গির্জার বিরাট দরজাগুলোর সামনে, তাদের পাপ স্খালনের জন্য জড়ো হওয়া কালো পোশাক পরা মেয়েদের নীরব অশুভ মূর্তিগুলো। ক্যাথিড্রালের মধ্যে থেকে একটা বিবর্ণ লাল আলো বাইরে এসে পড়ছিল—আর অদ্ভুত ইন্ডিয়ান কণ্ঠ একটা গান গাইছিল যেটা শুধুমাত্র আমি স্পেনেই শুনেছি।
“চলো ভেতরে গিয়ে উপাসনা অনুষ্ঠানটা দেখি,” আমি বলেছিলাম। “ওটা নিশ্চয়ই দেখার মতো হবে।”
“মোটেই না!” ঈষৎ অস্বাভাবিক কণ্ঠে ম্যাক বলে উঠেছিল। “আমি কোনো লোকের ধর্মের ব্যপারে নাক গলাতে চাই না।”
“তুমি কি ক্যাথলিক?”
“না,” সে উত্তর দিয়েছিল। “আমার মনে হয় আমি কিছুই নই। বহু বছর আমি কোনো গির্জায় যাইনি।”
“সাবাস তোমাকে!” চিৎকার করে উঠেছিলাম আমি। “তুমি তাহলে কুসংস্কারাচ্ছন্নও নও!”
কতকটা বিরাগ ভরে ম্যাক আমার দিকে তাকিয়েছিল। “আমি ধার্মিক লোক নই।” উদ্দীপ্তভাবে সে বলেছিল। “ কিন্তু আমি ভগবানের নিন্দা করে বেড়াই না। তাব মধ্যে অনেক বিপদ আছে।”
“বিপদটা কি?”
“কেন, যখন তুমি মরবে বুঝেছো...।” এবার বিরক্ত আর ক্রুদ্ধ হয়েছিল সে। চী-লীতে আরও দু’জন আমেরিকানের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল। তারা ছিল সেই ধরনের লোক যারা সব কিছু মন্তব্যের সূচনা করে “আমি এই দেশে সাত বছর রয়েছি, আর এই দেশের লোকদের আমি আদ্যোপান্ত চিনি।”
“মেক্সিকান মেয়েরা”, একজন বলেছিল, “পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে খারাপ। আরে, ওরা বছরে দু’বারের বেশি স্নান করে না। আর সতীত্বের কথা যদি বলো—তার কোনো অস্তিত্বই নেই। ওরা বিয়ে পর্যন্ত করে না। যে কোনো লোককে মনে ধরলেই তাকে জুটিয়ে নেয়। মেক্সিকান মেয়েগুলো সব বেশ্যা, মোদ্দা কথা হলো এটাই।”
“ছোট্টখাট্টো খাসা এক ইন্ডিয়ান মেয়ে রেখেছি টরিয়নে”, অন্য লোকটি আরম্ভ করেছিল। “এটা তো একটা অপরাধ। আরে, তাকে আমি বিয়ে করি না করি এমন কি তা নিয়েও সে মোটে মাথাই ঘামায় না। আমি—”
“ওদের ধরনই তাই”, বাধা দিয়ে অন্যজন বলেছিল। “নষ্ট চরিত্র! ওরা হলো তাই। আমি সাত বছর এদেশে রয়েছি।”
“আর জানো তো”, অন্য লোকটি আমার দিকে দৃঢ়ভাবে তার আঙুল নাড়লো। “এসব কথা তুমি কোনো মেক্সিকান গ্রীজার (Greaser) কে বলতো পারো, কিন্তু সে শুধু তোমাকে ঠাট্টা করবে! ঐ ধরনের নোংরা ছুঁচো সব ওরা!”
“ওদের কোনো আত্মসম্মানজ্ঞান নেই”, হতাশভাবে বলেছিল ম্যাক।
“কল্পনা করো একবার", প্রথম দেশওয়ালী ভাই আরম্ভ করেছিল। “কল্পনা করো যে এটা যদি তুমি একজন আমেরিকানকে বলতে তাহলে কি হতো !”
ম্যাক টেবিলের ওপর একটা ঘুষি মারলো। “বেঁচে থাকুক আমেরিকান মেয়ে।” সে বলেছিল।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments